প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jul 1, 2026 ইং
বরগুনায় দলীয় নেতা হত্যায় বাবার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ: নেপথ্যে পারিবারিক বিরোধ

একাধিক বিয়ের প্রতিবাদ করায় বাবার হাতে ছেলে খুনের অভিযোগ!
আমতলী প্রতিনিধি: বরগুনার আমতলীতে গুলিশাখালী ইউনিয়ন শ্রমিকদল সভাপতি রিপন কাজী হত্যাকাণ্ডে তার বাবা মিজানুর রহমান কাজীর বিরুদ্ধে পরিকল্পনার অভিযোগ তুলেছে পরিবার। মঙ্গলবার রাতে পটুয়াখালীতে দুর্বৃত্তদের হামলায় রিপন নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সভাপতি রিপন কাজী (৩৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে পটুয়াখালী সদর উপজেলার গগণখা এলাকায়। মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফেরার পথে ফারুক ডাক্তারের বাড়ির সামনে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল রিপন ও তার চাচাতো ভাই রাজিব কাজীর গতিরোধ করে। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিপনকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করলে ঘটনাস্থলেই তিনি গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে নিহতের বাবা মিজানুর রহমান ওরফে ভুট্টো কাজীর নাম উঠে এসেছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক ও পারিবারিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মিজানুর রহমানের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে, যা হত্যাকাণ্ডের সাথে তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে গণ্য করছে তদন্তকারী দল। নিহতের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই মিজানুর রহমানের একাধিক বিয়ে এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে রিপন কাজীর সাথে তীব্র বিরোধ চলছিল। পারিবারিক এই দ্বন্দ্বের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রিপন এবং তার চাচাতো ভাই গুলিশাখালী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি রিফাত কাজীর সাথেও প্রবল রেষারেষি ছিল। রিপনের ছোট ভাই সাব্বির কাজীর দাবি, এসব বিরোধের জের ধরেই বাবা মিজানুর রহমান, রিফাত কাজী ও তাদের সহযোগীরা মিলে এই হত্যাকাণ্ডের ছক তৈরি করেছিলেন। হামলায় বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী রাজিব কাজী জানান, হামলাকারী রাসেল কাজী প্রথমে রিপনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলে তারা মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়েন। রাজিব প্রাণ বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী খালে ঝাঁপ দিয়ে কোনোমতে রক্ষা পেলেও রিপন হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পাননি। পরিবারের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রতিহিংসার চরম বহিঃপ্রকাশ। ঘটনার প্রেক্ষিতে পুলিশের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক তৎপরতা বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইয়াকুব হোসাইন জানিয়েছেন, স্থানীয়দের সহায়তায় মোস্তফা কাজী ও ফিরোজ কাজী নামে দুজনকে আটক করে পটুয়াখালী সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পটুয়াখালী সদর থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান নিশ্চিত করেছেন যে, আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং মামলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে মূল অভিযুক্ত হিসেবে অভিযুক্ত মিজানুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন ঘটনার পরপরই এলাকা থেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ঘটনার নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের চিহ্নিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা। পারিবারিক কলহ যখন রাজনৈতিক আধিপত্যের সাথে মিশে যায়, তখন তা কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে, রিপন কাজী হত্যাকাণ্ড তারই একটি নগ্ন উদাহরণ। এই ঘটনার ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রশাসনকে কেবল আটককৃতদের ওপর নির্ভর না করে হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা প্রতিটি পক্ষকে আইনের আওতায় আনতে হবে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে এই ধরনের পরিকল্পিত সহিংসতা ভবিষ্যতে স্থানীয় অস্থিরতাকে আরও উসকে দিতে পারে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিধনের একটি ভয়ানক সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেবে।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered