প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 30, 2026 ইং
বরগুনায় শিশু বলাৎকারের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষক কারাগারে!

বেতাগী প্রতিনিধি: বরগুনার বেতাগীতে মাদ্রাসার শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক হাফেজ মুহাসিন হাসান ওরফে আব্দুর রহিমের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
বরগুনার বেতাগী উপজেলার ৪ নম্বর মোকামিয়া ইউনিয়নের একটি নূরানী মাদ্রাসায় এক শিশু শিক্ষার্থীকে জোরপূর্বক বলাৎকারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক হাফেজ মুহাসিন হাসান ওরফে আব্দুর রহিমকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গত সোমবার ২৯ জুন দুপুরে বেতাগী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে অভিযুক্ত নিজেই আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেছিলেন। তবে মামলার নথিপত্র, এজাহার এবং ভিকটিমের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে আদালতের বিচারক মো. আনোয়ার হোসেন জামিন নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গত ১৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সংঘটিত এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত শিক্ষক আত্মগোপনে ছিলেন। ঘটনার প্রায় আড়াই মাস পর আইনি প্রক্রিয়ায় তার এই আত্মসমর্পণ ও পরবর্তী কারাবাস পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার ভয়াবহতা এবং ভিকটিমের জবানবন্দির গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত জামিন নামঞ্জুরের এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। মামলার এজাহার এবং ভিকটিমের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র, যেখানে মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক গাফিলতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ভিকটিম জানায়, ঘটনার পরপরই সে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষককে বিষয়টি অবহিত করলেও কোনো বিচার পাওয়া যায়নি। উল্টো, মাদ্রাসার পরিচালক ও সেক্রেটারি ভিকটিমের পিতাকে ঘটনাটি চেপে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন এবং শিশুটিকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। ভিকটিমের জবানবন্দিতে আরও ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যেখানে সে দাবি করেছে যে অভিযুক্ত শিক্ষক এর আগেও একই মাদ্রাসার আরও কয়েক শিশুকে একইভাবে নিপীড়ন করেছেন। লোকলজ্জা ও ভয়ের কারণে এতদিন তারা মুখ খোলেননি। এছাড়া, অভিযুক্ত শিক্ষক অতীতে ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন মাদ্রাসায় একই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তার অপরাধ প্রবণতার চরম পর্যায়কে নির্দেশ করে।
আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন যে, অভিযুক্ত শিক্ষককে একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ফাঁসানো হয়েছে এবং তিনি নির্দোষ। তবে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভিকটিমের জবানবন্দি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং এর সাথে মাদ্রাসার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টার যোগসূত্র রয়েছে। অভিযুক্ত মুহাসিন হাসান ওরফে আব্দুর রহিম বামনা উপজেলার বাসিন্দা হলেও বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মনাম ব্যবহার করে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছেন, যা তার পেশাগত পরিচয় এবং নৈতিক অবস্থানের বিষয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, মাদ্রাসার পরিচালক ও সেক্রেটারি যারা ঘটনাটি গোপন রাখার চেষ্টা করেছেন, তারাও আইনত এই অপরাধের দায় এড়াতে পারেন না। তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা ও নজরদারি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং ছদ্মবেশধারী অপরাধীদের চিহ্নিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডকে আরও কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অপরাধের অভিযোগ এবং তার বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহারের প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই ঘটনার গভীরে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র বা দীর্ঘমেয়াদী বিকৃত মানসিকতার প্রভাব থাকতে পারে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের আশার সঞ্চার করলেও, ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ রোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা ছাড়া প্রকৃত সুরক্ষা সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered