প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 29, 2026 ইং
দুর্যোগ মোকাবিলায় বরগুনায় সিপিপির মাঠ মহড়া:

প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে সতর্কতা বার্তা
বরগুনা সদর উপজেলা প্রতিনিধি : ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) উদ্যোগে গত ২৯ জুন সোমবার জেলা স্কুল মাঠে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি বিষয়ক মাঠ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে বরগুনা বরাবরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকায়, দুর্যোগের সময় ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে এবং জনমনে সচেতনতা তৈরি করার লক্ষ্যেই এই মহড়া আয়োজন করা হয়। এদিন সকাল থেকেই বরগুনার আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন এবং বিরূপ আবহাওয়ার কারণে অঞ্চলটিতে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। তবে দুর্যোগের সময়কার বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মানসিকতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মকর্তারা বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেই মহড়ায় অংশ নেন। এই মহড়ার মূল লক্ষ্য ছিল ঘূর্ণিঝড় সংকেত পাওয়া মাত্রই কীভাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উপকূলীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া যায় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা ও উদ্ধার তৎপরতা নিশ্চিত করা যায়, তার একটি বাস্তবিক প্রতিফলন ঘটানো। ঝড়ের তীব্রতা ও বৈরী পরিবেশের মধ্যেই উদ্ধারকর্মীদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ দুর্যোগকালীন প্রস্তুতির ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মহড়া চলাকালীন মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুর্যোগকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক নিরসন এবং সঠিক নির্দেশনার অভাবই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক সময় ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার পরও তারা সঠিক আশ্রয়কেন্দ্রের দিকনির্দেশনা পান না কিংবা গবাদি পশু ও সম্পদ রক্ষায় দীর্ঘ সময় নষ্ট করে ফেলেন। মহড়ায় অংশ নেওয়া সিপিপির স্বেচ্ছাসেবকরা জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করার সময় অনেক সময় পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব বা উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত উপকরণের সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়, যা জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভুক্তভোগীদের মতে, কেবল মহড়া নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি পরিবারকে দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার যে জটিল প্রক্রিয়া, তা এই মহড়ার মাধ্যমে আরও নিখুঁত করার দাবি তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। মাঠ পর্যায়ে উদ্ধারকারীদের সাথে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, সিপিপির এই মহড়া মূলত দুর্যোগের সময়কার সমন্বয়হীনতা দূর করার একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ঝড়ের সময় উদ্ধারকর্মীদের প্রস্তুতির পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের তথ্য আদান-প্রদান এবং আশ্রয়কেন্দ্রের সক্ষমতা যাচাই করাই ছিল এই মহড়ার মূল উদ্দেশ্য। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মহড়া আয়োজন করলেই হবে না, বরং মাঠ পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা (রেসপন্স টাইম) আরও বাড়ানো প্রয়োজন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, এই মহড়ায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা এবং সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হবে। একইসাথে উপকূলীয় এলাকার জনবসতিগুলোতে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
উপস্থিত ছিলেন বরগুনা সদর উপজেলার ইউএনও, সিপিসি টিম লিডার, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
পরিশেষে, বরগুনার এই মাঠ মহড়াটি দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রবল ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে আয়োজিত এই মহড়া প্রমাণ করেছে যে, দুর্যোগ মোকাবিলায় কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, বরং জনসচেতনতা এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতিই জীবন বাঁচানোর মূল চাবিকাঠি। যদি এই ধরনের মহড়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায় এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়, তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সময় জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সামগ্রিকভাবে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক কৌশল গ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রস্তুতিকে আরও গতিশীল করার মাধ্যমেই বরগুনা তথা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered