প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 28, 2026 ইং
বরগুনায় জেলা ফল মেলা-২০২৬: পুষ্টি নিরাপত্তা ও দেশীয় ফলের বাণিজ্যিক প্রসারে নতুন দিগন্ত

বরগুনা প্রতিনিধি : ‘করব মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করব বারো মাস’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত জেলা ফল মেলা-২০২৬ দেশীয় ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে উদ্বোধন করা হয়েছে।
রবিবার ২৮ জুন সকাল ১১টায় বরগুনা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বর্ণাঢ্য আয়োজনে জেলা ফল মেলা-২০২৬ এর উদ্বোধন করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরগুনার উপ-পরিচালক কৃষিবিদ রথীন্দ্রনাথ বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল উপকূলীয় অঞ্চলে দেশীয় ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ফল সংরক্ষণের আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা। জেলা প্রশাসক মিজ্ তাছলিমা আক্তারের প্রধান আতিথ্যে আয়োজিত এই মেলায় স্থানীয় পর্যায়ের কৃষক, উদ্যোক্তা এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন, যা বরগুনার কৃষি অর্থনীতিতে ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর ফল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করাই ছিল এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত কৃষকদের অভিযোগ ও বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানির প্রভাব এবং সঠিক সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ দেশীয় ফল নষ্ট হয়ে যায়।
প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিরা জানান, উন্নত জাতের চারা প্রাপ্তি এবং ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তির অভাবে তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভুক্তভোগী কৃষকদের মতে, শুধু মেলা আয়োজন করলেই হবে না, মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং হিমাগার সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। ফল চাষি মো. সোলাইমান মিয়া বলেন, ভালো ফলন হলেও সংরক্ষণের অভাবে আমরা বাজারজাত করতে পারি না, যার ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে লোকসানে পণ্য বিক্রি করতে হয়। এই বাস্তব পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে, উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের আগ্রহ থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় ফল উৎপাদন খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা কৃষকদের এসব সমস্যার সমাধানে প্রশাসনিক নজরদারি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক মিজ্ তাছলিমা আক্তার জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি পরিবারকে অন্তত কয়েকটি ফলজ গাছ রোপণ করতে হবে এবং ফলের অপচয় রোধে সচেতন হতে হবে। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা, সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক অনিমেষ বিশ্বাস, তারা পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিষমুক্ত ফল উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরগুনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম মোল্লা। এছাড়াও বরগুনা প্রেসক্লাবের সভাপতি হাফিজুর রহমান সহ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব হুমায়ূন শাহীন, জেলা বিএনপি'র সাবেক সহ-সভাপতি সালেহ ফারুক, ইসলামী আন্দোলনের সাকুর ও বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকগণ উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মেলায় প্রদর্শিত বিভিন্ন জাতের দেশীয় ফলের স্টলগুলো থেকে দর্শনার্থীরা উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারছেন। তবে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি এবং কৃষকদের মাঝে জৈব সার ও উন্নত জাতের বীজ বিতরণের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি। পরিশেষে, বরগুনার এই ফল মেলা স্থানীয় পর্যায়ে পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদি সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারা ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ করেন, তবেই এই মেলা সার্থকতা লাভ করবে। ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অপচয় রোধের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে বরগুনার কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে এই ধরনের আয়োজন নিয়মিত বজায় রাখলে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবেন, যা জাতীয় পর্যায়ে ফল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered