প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 27, 2026 ইং
বরগুনায় ঠিকাদারি সিন্ডিকেট: টেন্ডার কারসাজি ও প্রকৌশলীর অডিও ফাঁস:

উন্নয়নের নামে হরিলুট!
নিজস্ব প্রতিবেদক: বরগুনার তালতলী উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে টেন্ডার কারসাজি, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং প্রকৌশলীদের বিতর্কিত অডিও ফাঁসকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং সড়ক নির্মাণ প্রকল্প—দুই ক্ষেত্রেই সরকারি অর্থ লুটপাট, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. সাখাওয়াত হোসেন। সূত্র জানায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের চতুর্থ ধাপে তালতলী উপজেলায় এডিপির আওতায় ৩৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ৩ জুন উপজেলা পরিষদের প্রকল্প বাছাই কমিটির সভায় পূর্ববর্তী ধাপের ঘাটতি বাবদ ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা রেখে ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার প্রকল্প পিআইসি এবং ২১ লাখ ৯৬ হাজার টাকার ১৭টি প্রকল্প আরএফকিউ (RFQ) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, আরএফকিউ পদ্ধতির বিধি অনুসরণ না করে ১৭টি প্রকল্পকে চারটি প্যাকেজে ভাগ করে গোপনে ই-জিপির মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। স্থানীয় নিবন্ধিত ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ জন নিয়মিত ঠিকাদার থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশই টেন্ডারের বিষয়ে কোনো তথ্যই পাননি। তাদের দাবি, পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া পরিকল্পিতভাবে গোপন রেখে উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্র দাখিলের ব্যবস্থা করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মেসার্স প্রিন্স এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স নাইম এন্টারপ্রাইজ, আসিফ এন্টারপ্রাইজসহ মোট পাঁচটি লাইসেন্স ব্যবহার করে নামমাত্র প্রতিযোগিতা দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত চারটি প্যাকেজের কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রিন্স এন্টারপ্রাইজ ও নাইম এন্টারপ্রাইজ দুটি করে প্যাকেজের কাজ পায় এবং তাদের কাছে চূড়ান্ত অনুমোদনের বার্তাও পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সরকারি ই-জিপি আইডি ব্যবহার করে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। জানা যায়, ইউএনও এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন এবং অতীতে তার আইডি ব্লক হয়েছিল। তিনি নিজেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আরও দাবি করেন, সংসদ সদস্যের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমপি পাঁচটি লাইসেন্স পাঠিয়েছিলেন এবং সেগুলোর মাধ্যমেই আবেদন করা হয়। পরে ওই লাইসেন্সগুলোর মধ্য থেকে দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও তালতলীর তুলাতলী-নিউপাড়া সড়ক নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজ হাতবদল এবং প্রকৌশলীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি অডিও ক্লিপে উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন ও উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুদ্দিনের কথোপকথনে প্রকল্প বাস্তবায়নের নানা অনিয়ম উঠে এসেছে বলে অভিযোগ। অডিওতে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আঁখি কনস্ট্রাকশন থেকে কাজটি নয়ন মৃধার কাছে চলে যাওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম ভেঙে সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে এবং সড়কটি উদ্বোধনের আগেই বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা কার্যকর তদারকির পরিবর্তে ঠিকাদারদের স্বার্থ রক্ষায় বেশি সক্রিয় ছিলেন। বৃষ্টির অজুহাতে ত্রুটিপূর্ণ কাজকে গ্রহণযোগ্য দেখানোর চেষ্টা এবং ঠিকাদার পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ফাঁস হওয়া অডিওতে উপজেলা প্রকৌশলী জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি দাবি করেন, অনেক ঠিকাদার লাভের আশায় কাজ বিক্রি করে দেন। একই অডিওতে বদলির ক্ষেত্রে আট থেকে দশ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে বলে অভিযোগ, যা স্থানীয় প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগের অভ্যন্তরে দুর্নীতির অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
ভুক্তভোগী ঠিকাদার, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল উভয় ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডার কারসাজি, রাজনৈতিক প্রভাব, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট এবং নিম্নমানের কাজের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং জনগণ প্রত্যাশিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের দাবি, টেন্ডার প্রক্রিয়া, ফাঁস হওয়া অডিও এবং তুলাতলী-নিউপাড়া সড়কের নির্মাণমান—সব বিষয়েই এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা। উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি নিয়ম মেনেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সংসদ সদস্যের অভিপ্রায় অনুযায়ী হয়েছে।অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের পর ই-জিপির মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নিতে উপজেলা প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered