প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 27, 2026 ইং
মৃত্যুফাঁদে বরগুনার ৩৫৭টি সেতু: সংস্কারের অভাবে বিচ্ছিন্ন উপকূলের জনপদ

বরগুনা জেলা প্রতিনিধি: জেলায় দীর্ঘ দুই দশকের অধিক সময় ধরে সংস্কারবিহীন ৩৫৭টি ঝুঁকিপূর্ণ লোহার সেতু এখন স্থানীয়দের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে প্রতিদিন ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। পুরো বরগুনা জেলাজুড়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত শত শত লোহার সেতু এখন সাধারণ মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে নির্মিত এই সেতুগুলোর অধিকাংশই দুই দশকের বেশি সময় ধরে বড় ধরনের কোনো সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ কাজের আওতায় আসেনি। বর্তমানে জেলার ছয়টি উপজেলায় মোট ৩৫৭টি সেতুকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ১৮টি সেতু ধসে পড়েছে। আমতলী, বরগুনা সদর, বেতাগী, বামনা, পাথরঘাটা ও তালতলী উপজেলার এই সেতুগুলোতে মরিচা ধরা, কংক্রিটের স্লিপার ভেঙে যাওয়া এবং রেলিং না থাকার মতো মারাত্মক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন স্কুলগামী শিক্ষার্থী, জরুরি রোগী বহনকারী যানবাহন, কৃষক ও মৎস্যজীবীদের এই নড়বড়ে কাঠামোর ওপর দিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি করছে। ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে এসব সেতুর স্থায়ী সংস্কার না করায় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বরগুনা সদর উপজেলার বড় লবনগোলা-বাঁশবুনিয়া বাজার সংলগ্ন সেতুটির অবস্থা এতটাই নাজুক যে, স্থানীয়রা বাঁশ বা গাছের গুঁড়ি দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। মন্টু চৌধুরীর মতো স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, সেতু পার হওয়ার সময় সবসময় এক ধরনের মৃত্যুভয় কাজ করে, কারণ কাঠামোটি সামান্য ভারেই কেঁপে ওঠে। এলজিইডি কর্তৃপক্ষ কেবল 'ঝুঁকিপূর্ণ' সাইনবোর্ড লাগিয়ে দায় সারলেও, ভারী যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যখন সেতুগুলোর ক্ষয়প্রাপ্ত লোহার বিমগুলো পিচ্ছিল হয়ে পড়ে এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, জেলার সব ঝুঁকিপূর্ণ সেতু পুনর্নির্মাণের জন্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বাজেট প্রয়োজন, যার মধ্যে অতি জরুরি ১৪২টি সেতুর জন্য ৬৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের মতে, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় বসে থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে। জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামালের মতে, কেবল প্রস্তাবনা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ এবং বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক অবহেলার কারণে উন্নয়নের এই মৌলিক অবকাঠামোটি আজ জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি দিনই স্থানীয়দের জন্য এক একটি নতুন ঝুঁকির বার্তা বহন করে আনছে। উপকূলীয় জেলা বরগুনার সামগ্রিক কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়ন মূলত এই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরই নির্ভরশীল। ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলোর কারণে স্থানীয় অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে জেলার অগ্রগতির পথে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল নতুন প্রকল্প অনুমোদনের দিকে তাকিয়ে না থেকে, বিদ্যমান সেতুগুলোর দ্রুত ও কার্যকর পুনর্নির্মাণ নিশ্চিত করা জরুরি। জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার না দিলে এবং দ্রুত কংক্রিটের গার্ডার সেতু নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে, যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় দুর্ঘটনা পুরো উপকূলীয় জনপদকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered