প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 25, 2026 ইং
বরগুনার তালতলীতে জেলেদের চাল আত্মসাতের ঘটনায় ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা!

তালতলী প্রতিনিধি: বরগুনার তালতলীতে জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত ৫ টনেরও বেশি ভিজিএফের চাল আত্মসাতের অভিযোগে এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন অপর এক সদস্য! আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন- বরগুনার তালতলী উপজেলার কড়ইবাড়িয়া ইউনিয়নে জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফের চাল আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বরগুনা সিনিয়র স্পেশাল ট্রাইবুনাল-১ আদালতে দুর্নীতি দমন আইনে মামলাটি দায়ের করেন একই ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও ২ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান মুহাম্মদ রেদওয়ান উল্লাহ। মামলার প্রধান আসামি কড়ইবাড়িয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও ১ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান মো. ফজলুল হক বাচ্চু। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারের মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ৬৬ টন ৮৮০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে এই চাল বিতরণের দায়িত্ব লিখিতভাবে অর্পণ করা হয় অভিযুক্ত ফজলুল হক বাচ্চুর ওপর। অভিযোগকারী ও মামলার সাক্ষীরা দাবি করছেন, বিতরণের সময় নিয়মবহির্ভূতভাবে মোট ৫ টন ৬৮০ কেজি চাল আত্মসাৎ করেছেন অভিযুক্ত ইউপি সদস্য, যা সরাসরি সরকারি সম্পদ তছরুপের সামিল। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে আগামী ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পটুয়াখালী সমন্বিত দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয়কে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার অভিযোগ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই অনিয়মের বিষয়টি সাধারণ মানুষের নজরে আসার পর থেকেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে বিরোধ চরমে পৌঁছায়। মামলার বাদীসহ মোট ছয়জন ইউপি সদস্য সাক্ষী হিসেবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন, যা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার একটি বড় প্রমাণ। ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীদের দাবি, গত ১০ এপ্রিল ৭৬৫ জন নিবন্ধিত জেলের মধ্যে চাল বিতরণের কথা থাকলেও প্রায় ছয় টন চাল বিতরণের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে গত ২২ এপ্রিল বরগুনা জেলা প্রশাসক, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বরিশাল বিভাগীয় পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ৪ জুন আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পরও কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় তারা আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছেন। জনপ্রতিনিধিদের এমন কর্মকাণ্ড সাধারণ জেলেদের খাদ্য নিরাপত্তা ও সরকারি সহায়তার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যেখানে খোদ স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, সেখানে সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে মামলার প্রধান আসামি মো. ফজলুল হক বাচ্চু তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এবং তার সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার হীন মানসিকতা থেকে এই মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, সরকারি নিয়ম মেনেই বরাদ্দকৃত সবটুকু চাল নিবন্ধিত জেলেদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে এবং এর সপক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র তার কাছে রয়েছে। অন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. জিয়াউদ্দিন জানিয়েছেন যে, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই মামলাটি করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে দুদকের নিরপেক্ষ তদন্তে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে তারা আশাবাদী। সরকারি এই চালের হিসাব না মেলা এবং পরবর্তীতে আইনি লড়াইয়ের এই পর্যায়টি প্রমাণ করে যে, স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সম্পদ বিতরণে মনিটরিং ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই মাঠপর্যায়ে সরকারি ত্রাণ বা সহায়তা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই মামলার রায় ও তদন্ত প্রতিবেদন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন দেখার বিষয়। তবে সরকারি চাল আত্মসাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। যদি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে তা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি রাখে, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পের অর্থ বা খাদ্য সহায়তা বিতরণে কেউ অনিয়মের সাহস না পায়। এছাড়া, সাধারণ জেলেদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিতরণ প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর তদারকি ও ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে পড়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের এই তদন্ত প্রতিবেদন কেবলমাত্র একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং তালতলীর প্রান্তিক জেলেদের অধিকার রক্ষার একটি পরীক্ষা হিসেবে গণ্য হবে।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered