প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 20, 2026 ইং
বরগুনা জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার: ১৯৮২ থেকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু

বরগুনা প্রতিনিধি: ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত বরগুনা জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারটি উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও জনবল সংকট ও ক্যানটিন সুবিধার অভাবে এর পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বরগুনা জেলা শহরের থানা পাড়ায় ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারটি বর্তমানে উপকূলীয় জনপদটির প্রধান জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। জেলা পরিষদ রোডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে গ্রন্থাগারটিতে বই, পত্রিকা, জার্নাল এবং গবেষণামূলক প্রকাশনার এক বিশাল সম্ভার রয়েছে, যা স্থানীয় পর্যায়ের পাঠকদের মেধা বিকাশে সরাসরি অবদান রাখছে। বিশেষ করে রেফারেন্স কর্নার, মুক্তিযুদ্ধ কর্নার এবং জব কর্নার চালুর মাধ্যমে এটি চাকরিপ্রার্থী ও গবেষকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য স্থানে পরিণত হয়েছে। এছাড়া শিশুদের জন্য পৃথক কর্নার এবং চিত্রাঙ্কনসহ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের সুযোগ থাকায় এটি নতুন প্রজন্মের পাঠাভ্যাস তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে সমৃদ্ধ সংগ্রহের বিপরীতে জনবল সংকট এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক কর্মযজ্ঞকে সীমিত করে ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে গ্রন্থাগারটির পরিবেশ এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে নিয়মিত পাঠকরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও মৌলিক কিছু সুবিধার অভাব তাদের দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে বাধা দিচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করা পাঠকদের জন্য কোনো ক্যানটিন ব্যবস্থা না থাকায় তাদের তীব্র ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। নিয়মিত পাঠক ও সাংস্কৃতিককর্মী আতিকুর রহমান এবং বরগুনা আত্মোন্নয়ন মঞ্চের সুবাহ্ তাবাসসুম ঐশীর মতে, এটি কেবল একটি পাঠাগার নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে, যেখানে ক্যানটিন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পাঠকদের উপস্থিতি ও অবস্থান আরও দীর্ঘস্থায়ী হতো। এদিকে নিভৃত পাঠক সংঘের সভাপতি মারিয়া আক্তার মায়া পরিবেশের আরও নান্দনিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তার মতে, গ্রন্থাগারের ভেতর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শন করলে তা শিশু ও তরুণদের পাঠে আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে। এছাড়া পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য বিশেষ পাঠ-সুযোগ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন আশার আলো পাঠশালার সভাপতি ইফরাত ইমা, যিনি মনে করেন গ্রন্থাগারের কার্যক্রম সম্পর্কে জেলার প্রতিটি স্কুল-কলেজে ব্যাপক প্রচার চালানো প্রয়োজন।
গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, জনবল সংকটের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও তারা পাঠকদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। লাইব্রেরিয়ান ও সহকারী পরিচালক মো. দেলুয়ার হোসেন জানিয়েছেন, সীমিত জনবল নিয়ে গ্রন্থাগারটি পরিচালনা করা চ্যালেঞ্জিং হলেও পাঠকদের ক্রমবর্ধমান ইতিবাচক সাড়া তাদের অনুপ্রাণিত করছে। তবে স্থানীয় সচেতন মহল এবং পাঠকদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, সরকারি উদ্যোগে জনবল নিয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষ করে পাঠকদের দীর্ঘ সময় অবস্থান নিশ্চিত করতে ক্যানটিন চালুর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ-পরিবেশ এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচিগুলোকে আরও বেগবান করার দাবি দীর্ঘদিনের। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিলে গ্রন্থাগারটি কেবল একটি ভবন হিসেবে নয়, বরং জেলার বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের প্রকৃত হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। সামগ্রিকভাবে বরগুনা জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের এই সংকট ও সম্ভাবনা জেলাটির সামগ্রিক শিক্ষা পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে যখন পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তখন এই গ্রন্থাগারটিই তরুণ সমাজকে বইমুখী রাখার প্রধানতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। তাই এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আধুনিকায়ন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দাবি নয়, বরং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের একটি অপরিহার্য শর্ত। যথাযথ নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্রন্থাগারটির সেবার মান বৃদ্ধি করা গেলে তা ভবিষ্যতে জেলার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও মেধা চর্চার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করবে।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered