প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 19, 2026 ইং
বরগুনার পাথরঘাটায় অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দৌরাত্ম্য!

পাথরঘাটা প্রতিনিধি: বরগুনার পাথরঘাটায় নামী প্রতিষ্ঠানের নাম ও ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ছবি ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যা সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ-
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা খাতের আড়ালে গড়ে উঠেছে এক বিশাল প্রতারক চক্র, যারা ঢাকা ও বরিশালের নামী চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীসহ বড় শহরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল রোগীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাইকিংয়ের মাধ্যমে উচ্চশব্দে প্রচারণা চালানো হলেও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠানে যে মানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কথা প্রচার করা হয়, বাস্তবে তাদের কোনো উপস্থিতি পাওয়া যায় না। রোগীদের ভুল বুঝিয়ে অথবা ভয় দেখিয়ে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার দীর্ঘ তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবার নৈতিকতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই অনিয়ম কেবল শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য খাতের পুরো কাঠামোকে একটি অসাধু বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
ভুক্তভোগী রোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ক্লিনিকে পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকলেও সব ধরনের রিপোর্টের ফলাফল তৈরি করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, এসব প্রতিষ্ঠান রোগী সংগ্রহের জন্য একদল মার্কেটিং অফিসার বা দালাল নিয়োগ করেছে, যারা পল্লী চিকিৎসক ও স্থানীয় ফার্মেসি মালিকদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের কমিশন চুক্তিতে আবদ্ধ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী জানিয়েছেন, ল্যাব পরীক্ষার মোট বিলের প্রায় ৬০ শতাংশই কমিশন হিসেবে দিতে হয় রোগী পাঠানো ব্যক্তিকে। এই ভয়াবহ কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে কিছু অসাধু চিকিৎসকও জড়িয়ে পড়েছেন, যারা রোগীদের প্রেসক্রিপশনে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা লিখে বাড়তি অর্থ উপার্জনে সহায়তা করছেন। এমনকি ওষুধ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের মূল্যবান উপহার বা প্রলোভন দেখিয়ে নিম্নমানের ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যার ফলে দরিদ্র রোগীরা শেষ পর্যন্ত কেবল আর্থিক ক্ষতির শিকারই হচ্ছেন না, বরং ভুল চিকিৎসার ঝুঁকিও বহন করছেন।
এই নজিরবিহীন অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনো পরিলক্ষিত হয়নি। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি পাথরঘাটা উপজেলার সিনিয়র সহসভাপতি অধ্যক্ষ মো. জিয়াউল করিমের মতে, স্বাস্থ্যসেবাকে পুঁজি করে এই অনৈতিক বাণিজ্য কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং দ্রুত অভিযান চালিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এদিকে বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ জানিয়েছেন যে, তারা অবৈধ প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করছেন এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাথরঘাটার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপশ পাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাঈদুর রহমান উভয়ই অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত অভিযানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং নিয়মিত তদারকি সেল গঠন এবং কঠোর নজরদারি ছাড়া এই অসাধু চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। চিকিৎসাসেবার নামে এই প্রতারণা ও কমিশন বাণিজ্য পাথরঘাটার সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে এবং সরকারি হাসপাতালের ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। যদি দ্রুত এই অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এই চক্রটি বন্ধে সরকারি হস্তক্ষেপের পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় জবাবদিহিমূলক তদারকি সেল গঠন করা এখন সময়ের দাবি। সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে এবং প্রান্তিক মানুষের ভোগান্তি কমাতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে তাদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে, নতুবা স্বাস্থ্যসেবার নামে এই কসাইখানাগুলো সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চালিয়েই যাবে।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered