প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 15, 2026 ইং
বরগুনায় প্রাণিসম্পদ খাতে চরম সংকট: টিকা ও ওষুধের অভাবে বিপাকে হাজারো খামারি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বরগুনা জেলার প্রাণিসম্পদ খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যেখানে সরকারি অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে খামারিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। জেলার সদর, আমতলী, তালতলী, বামনা, পাথরঘাটা ও বেতাগী উপজেলার খামারিদের অভিযোগ, পিপিআর টিকাসহ গবাদিপশুর জীবন রক্ষাকারী জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে ছাগল ও ভেড়ার প্রাণঘাতী পিপিআর রোগ এবং গরুর খুরা রোগ, লাম্পি স্কিন ডিজিজ, ব্ল্যাক কোয়ার্টার ও হেমোরেজিক সেপটিসেমিয়ার মতো সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। টিকাদান কর্মসূচির এই চরম ব্যর্থতার ফলে একদিকে যেমন গবাদিপশু মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে খামারিরা তাদের মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে রয়েছেন। মূলত মাঠ পর্যায়ে সঠিক তদারকির অভাব এবং চাহিদার তুলনায় টিকার অপ্রতুল সরবরাহ এই বিপর্যয়কে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
সরেজমিনে ভুক্তভোগী খামারিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারি টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। মাইঠা বড় লবনগোলা গ্রামের ছাগল খামারি মো. হুমায়ুন কবির অভিযোগ করেন যে, প্রাণিসম্পদ অফিসে বারবার ধর্ণা দিয়েও পর্যাপ্ত পিপিআর টিকা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে বেসরকারি উৎস থেকে ওষুধ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। একইভাবে পাথরঘাটার গরু খামারি রিয়াজুল ইসলাম জানান, খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেলেও সময়মতো সরকারি সেবা পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে আক্রান্ত গরুগুলো খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে। বেতাগীর খামারি আবদুল লতিফ বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ভেটেরিনারি সেবা না থাকায় সামান্য অসুস্থতার জন্য উপজেলা সদরে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, কিন্তু সেখানেও ডাক্তার বা ওষুধের সংকট প্রকট। এই বাস্তব পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারিরা প্রশাসনিক অবহেলার কারণে তাদের গবাদিপশু নিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।
খামারিদের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বরগুনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান সংকটের সত্যতা স্বীকার করে জানান যে, চাহিদার তুলনায় ওষুধের সরবরাহ অত্যন্ত অপ্রতুল। তিনি এই সংকটের পেছনে জটিল সরবরাহ চেইনকে দায়ী করে বলেন, বরগুনার জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ প্রথমে বরিশাল কার্যালয়ে পাঠানো হয়, যা সেখান থেকে বরগুনায় পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। প্রশাসনিক এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রতি মাসেই খামারিরা সময়মতো টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে কেবল সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটিই নয়, বরং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত নজরদারি এবং ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসার অভাবকেও এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। খামারিদের পক্ষ থেকে দ্রুত পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি সেবা চালুর জোরালো দাবি জানানো হয়েছে, যাতে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বরগুনার সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জেলার হাজার হাজার পরিবার গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে, যা স্থানীয় আমিষের চাহিদাও পূরণ করে। কিন্তু বর্তমানে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে এবং পশুর অকাল মৃত্যুতে খামারিরা বিনিয়োগ হারানোর আতঙ্কে ভুগছেন। যদি কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই সরবরাহ সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে এবং মাঠ পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে, তবে বরগুনার প্রাণিসম্পদ খাত এক বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এটি কেবল খামারিদের ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণই হবে না, বরং জেলার সামগ্রিক প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered