প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 15, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 14, 2026 ইং
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিশুশ্রমের ভয়াবহতা: বরগুনায় সচেতনতামূলক মানববন্ধন

বরগুনা সদর উপজেলা প্রতিনিধি: বিশ্ব শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বরগুনায় আয়োজিত মানববন্ধনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
বিশ্ব শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আজ রবিবার (১৪ জুন, ২০২৬)-এ বরগুনা প্রেসক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদী মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়, যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত শিশুশ্রমকে সরাসরি লাল কার্ড প্রদর্শন করা হয়েছে। টিআইবি ও স্থানীয় সচেতন মহলের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশুদের অংশগ্রহণ বন্ধে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের শৈশবকে সুরক্ষা দেওয়া। মূলত দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে যে শিশুরা শিক্ষা ও খেলাধুলার পরিবর্তে বর্জ্য সংগ্রহের মতো অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে, তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া হয়েছে, যা কেবল বরগুনা নয়, বরং পুরো দেশের শিশু অধিকার পরিস্থিতির একটি নগ্ন চিত্র তুলে ধরেছে। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন ভুক্তভোগী পরিবার ও অধিকার কর্মীরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের ভয়াবহ ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, বর্জ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত শিশুরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি, ধারালো বস্তুর আঘাত এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক অভিভাবক নিরুপায় হয়ে তাদের সন্তানদের এই কাজে পাঠাচ্ছেন, কিন্তু এর ফলে শিশুরা যে কেবল শারীরিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, বরং তারা মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো একটি অপরিহার্য সেবা খাতে শিশুদের ব্যবহার করা কেবল অমানবিকই নয়, বরং এটি বিদ্যমান শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শিশুদের হাতে বই বা কলম থাকার কথা থাকলেও সেখানে ময়লার ঝুড়ি বা বর্জ্যের বস্তা তুলে দেওয়া আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করে টিআইবি এবং স্থানীয় প্রতিনিধিরা দাবি জানিয়েছেন যে, শুধু দিবস পালন করলেই শিশুশ্রম বন্ধ হবে না, বরং মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় যারা শিশুদের কাজে লাগাচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তবুও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, নজরদারির অভাবে এই শিশুদের একটি বড় অংশ এখনো বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্রে শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুদের অধিকার নিশ্চিতকরণে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে, যাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতে কোনোভাবেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার করা না হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবং শিশুশ্রম নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
পরিশেষে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিশুশ্রমের এই ভয়াবহ প্রবণতা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা। যদি শিশুদের শৈশবকে এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে অপচয় করা হয়, তবে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও শিক্ষিত সমাজ গঠন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং একটি শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি শিশুর শিক্ষা ও নিরাপত্তার অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি, অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশ মেধা ও সুস্থতা হারিয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
© স্বত্বাধিকার : আবেদীন প্রিন্টিং প্রেস ও সোহাগ কনস্ট্রাকশন