প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 15, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 6, 2026 ইং
বরগুনার আমতলী ও তালতলীতে ড্রেজার ও বোমা মেশিনে বালু উত্তোলনের অভিযোগ!

বরগুনায় অবৈধ ড্রেজারের দৌরাত্ম্য:
পরিবেশ বিপর্যয় ও ভূমি ধসের মুখে জনপদ-
আমতলী প্রতিনিধি: বরগুনার আমতলী ও তালতলী উপজেলাজুড়ে প্রভাবশালী একটি চক্রের প্রত্যক্ষ মদদে নদী, খাল, বিল ও আবাদি জমির কোল ঘেঁষে চলছে ভয়াবহ অবৈধ বালু উত্তোলন কার্যক্রম। শক্তিশালী ‘বোমা’ মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে গভীর রাত থেকে শুরু করে দিনের বিভিন্ন সময়ে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে জনপদগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় আসন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ড্রেজার জব্দ এবং জরিমানা করা হলেও, আইনি কঠোরতার অভাব ও নজরদারির দুর্বলতায় এই অবৈধ কর্মকাণ্ড থামছে না। মূলত স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প ও সড়ক নির্মাণের ঠিকাদাররা খরচ কমাতে অনুমোদিত বালুমহালের পরিবর্তে নিকটবর্তী ফসলি জমি ও জলাশয় থেকে অবৈধভাবে বালু সংগ্রহ করছে, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং জনস্বার্থের পরিপন্থী।
ভুক্তভোগী স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অবৈধ ড্রেজিংয়ের ফলে তাদের কৃষি জমি ও বসতবাড়ি চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তালতলীর বাসিন্দা হারুন অর রশিদ মোল্লা ও কৃষক মো. শাহীন হাওলাদারের ভাষ্যমতে, রাস্তার কাজের অজুহাতে পার্শ্ববর্তী ফসলি জমি থেকে বালু তোলায় জমি দেবে যাচ্ছে এবং উৎপাদনক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া ‘বোমা’ মেশিনের বিকট শব্দে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, যা লাউপাড়া গ্রামের রেহানা বেগমের মতো স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নিত্যদিনের যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে এভাবে বালু উত্তোলন করলে তলদেশ অস্বাভাবিক গভীর হয়ে পাড় দুর্বল হয়ে পড়ে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের নদীভাঙন ও ভূমি ধসের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইন প্রয়োগের ধীরগতি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নাগরিক সমাজ। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরগুনা জেলা কমিটির সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদেরের মতে, বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী সেতু, বাঁধ ও জনবসতির সন্নিকটে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামালের দাবি, কেবল জরিমানা বা সাময়িক যন্ত্রপাতি জব্দ করে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈধ বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি, যাতে করে অসাধু চক্র বারবার আইন লঙ্ঘনের সাহস না পায়।
দীর্ঘমেয়াদে এই অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন বরগুনার গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর অপূরণীয় প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃষিজমি হারিয়ে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নয়নের নামে পরিবেশের এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অবিলম্বে কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বরগুনার নদী-নির্ভর জনপদগুলোতে বাস্তুচ্যুতি ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা।
© স্বত্বাধিকার : আবেদীন প্রিন্টিং প্রেস ও সোহাগ কনস্ট্রাকশন