প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 5, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 4, 2026 ইং
বরগুনায় সমাজসেবা কর্মকর্তা পরিচয়ে এক নারীর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ:

লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে উধাও জাকিয়া সুলতানা!!
আমতলী প্রতিনিধি: বরগুনার আমতলীতে সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ১০ জনের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে জাকিয়া সুলতানা নামের এক নারীর বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
বরগুনার আমতলীতে সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জাকিয়া সুলতানা নামের এক নারীর বিরুদ্ধে। নিজেকে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তিনি দীর্ঘ এক বছর ধরে স্থানীয় অসহায় মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন। গত বৃহস্পতিবার ভুক্তভোগী জসিম মিয়াসহ ১০ জন ব্যক্তি আমতলী থানায় এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গভীর নলকূপ স্থাপন, ফ্যামিলি কার্ড, ভিজিডি কার্ড, বিধবা, বয়স্ক ও মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদানের নাম করে তিনি অন্তত ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সরকারি সহায়তার আশায় থাকা নিম্ন আয়ের মানুষগুলো প্রতারক জাকিয়ার মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হয়ে সহায়-সম্বল হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের পাতাকাটা এলাকার বাসিন্দা লতিফ মাদবরের মেয়ে এই জাকিয়া সুলতানা অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেকে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়েছেন। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে অভিযুক্ত জাকিয়া সুলতানা আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরগুলোও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জাকিয়া সুলতানা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সরকারি প্রকল্পের তালিকা তৈরির কথা বলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন। জসিম মিয়ার মতো একাধিক ভুক্তভোগী জানান, গভীর নলকূপ বসানোর নামে তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও নলকূপের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। একইভাবে রুস্তুম মৃধা, ফিরোজা বেগম, নুরজাহান বেগম ও মাহফুজা বেগম জানান, নলকূপের আশায় তারা সম্মিলিতভাবে ৮০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছেন প্রতারক জাকিয়ার হাতে। এছাড়া পরিভানু, রোজিনা ও শাহিনুর বেগমের কাছ থেকে ভিজিএফ কার্ডের নামে ১২ হাজার টাকা এবং মাহিয়া বেগমের কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে ৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, তারা অত্যন্ত কষ্ট করে ঋণ করে এই টাকা জোগাড় করেছিলেন। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও জাকিয়া সুলতানা কোনো সুবিধা না দিয়ে উল্টো টালবাহানা শুরু করেন এবং গত এক মাস ধরে টাকা ফেরত দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের অভিযোগ, সরকারি দপ্তরের নাম ভাঙিয়ে এমন নির্লজ্জ প্রতারণা কেবল আর্থিক ক্ষতিই করেনি, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি সেবার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। ভুক্তভোগীরা এখন প্রশাসনের কাছে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, এই জালিয়াতির ঘটনায় আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের দায়বদ্ধতা ও প্রশাসনিক নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে! উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাঞ্জুরুল হক কাওসার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, জাকিয়া সুলতানা নামের কেউ অত্র দপ্তরে কখনোই কর্মরত ছিলেন না। তিনি জানান, দপ্তরের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার বিষয়টি অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হবে। অন্যদিকে, আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু শাহাদাৎ মো. হাছনাইন পারভেজ জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তারা তদন্ত শুরু করেছেন। অভিযুক্ত নারী বর্তমানে এলাকায় অবস্থান করছেন না বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে কোনো সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য সরাসরি দপ্তরে যোগাযোগ করতে এবং কোনো ব্যক্তিবিশেষকে অগ্রিম অর্থ প্রদান না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, বরগুনার এই ঘটনাটি প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর প্রতারক চক্রের চিত্র তুলে ধরেছে। স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে দীর্ঘ এক বছর ধরে এমন অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষ যাতে এ ধরনের দালাল চক্রের খপ্পরে না পড়ে, সেজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানো এবং সরকারি সেবার প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সহজ করার তাগিদ দিয়েছেন সচেতন মহল। জাকিয়া সুলতানার মতো প্রতারকদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও অনেক সাধারণ মানুষ সরকারি সুবিধার নামে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি এখন আমতলীবাসীর জন্য একটি বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
© স্বত্বাধিকার : আবেদীন প্রিন্টিং প্রেস ও সোহাগ কনস্ট্রাকশন