প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 5, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 3, 2026 ইং
বরগুনায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার সড়কে অনিয়মের অভিযোগ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে!

তালতলী প্রতিনিধি: বরগুনার তালতলীতে ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে সরকারি খাল ও কৃষিজমি ধ্বংস করে চলছে এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।
বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নে প্রায় ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু থেকেই চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে এম/এস লুৎফুল কবির নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কবিরাজপাড়া বাজার, নিশানবাড়িয়া ইউপি অফিস থেকে নিদ্রা স্লুইস বাজার এবং সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মেনিপাড়া বাজার পর্যন্ত সংযোগ সড়কগুলোর কাজ বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির শুরু থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে স্থানীয় সরকারি খাল, রাস্তার পাশের নালা এবং ব্যক্তিগত কৃষিজমি থেকে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু করে। এই বালু উত্তোলনের ফলে শুধু যে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে তা নয়, বরং সড়কের ভিত্তি নির্মাণেও ভয়াবহ কারচুপি করা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ তুলেছেন। মূলত কাজের ব্যয় কমিয়ে সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ করার লক্ষ্যেই বালুর পরিবর্তে কাদামাটি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই সড়কগুলোর স্থায়িত্বকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে দিন-রাত ড্রেজার চালিয়ে যেসব উপকরণ সংগ্রহ করছে, তা মূলত বালু নয় বরং অত্যন্ত নিম্নমানের কাদাযুক্ত মাটি। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের মতে, সড়কের ভিত্তি হিসেবে বালুর পরিবর্তে এই কর্দমাক্ত মাটি ব্যবহারের ফলে অতিবৃষ্টি বা বর্ষা মৌসুমে সড়কগুলো দেবে যাওয়া বা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা শতভাগ। এছাড়া, অবৈধ ড্রেজার ব্যবহারের ফলে সরকারি খালগুলোর তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর হয়ে পাড় ধসে পড়ছে, যা নিকটবর্তী আবাদি জমিগুলোকে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এই অনিয়ম চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ তদারকির অভাবে ঠিকাদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত খাল ও নালাগুলো নষ্ট হওয়ায় ভবিষ্যতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় কৃষকদের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন।
সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইউনুছ ফরাজী কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে জানিয়েছেন যে, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে ড্রেজার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পুনরায় এমনটি ঘটলে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে, এলজিইডি বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান জানান যে, কার্যাদেশের শর্ত ও নকশার বাইরে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই এবং যদি অননুমোদিত উপকরণ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কেবল ড্রেজার বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রকল্পের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যে নিম্নমানের কাজ হয়েছে, তার গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকল্পের স্বচ্ছতা যাচাই করা প্রয়োজন।
উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সরকারি সম্পদ ধ্বংস ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টির এই চিত্র উন্নয়ন খাতের স্বচ্ছতার অভাবকে প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। কোটি টাকার এই প্রকল্প যদি এভাবে অনিয়মের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, তবে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াত সমস্যার কোনো সুরাহা হবে না। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের ব্যয়, উপকরণের উৎস এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হোক, যাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই প্রকল্পের মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ না পায়। অবিলম্বে যদি কাজের মান ও উপকরণের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই সড়কগুলো অচিরেই জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। প্রকল্পের প্রকৃত সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে অনিয়মকারী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট তদারককারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।
© স্বত্বাধিকার : আবেদীন প্রিন্টিং প্রেস ও সোহাগ কনস্ট্রাকশন