প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 5, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 3, 2026 ইং
কুয়াকাটার ভাড়া বাসায় বরগুনার এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু:

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পারিবারিক কলহের জেরে নিজ ভাড়া বাসায় সাইয়েদুল আবেদীন নামের এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পাঞ্জুপাড়া এলাকায় গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাইয়েদুল আবেদীন নামের (৪২) বছর বয়সী এক যুবকের নিথর দেহ উদ্ধার করেছে মহিপুর থানা পুলিশ। জানা গেছে, বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলা সদরের বাসিন্দা আব্দুস সালাম জোয়াদ্দারের ছেলে সাইয়েদুল গত ২০ দিন ধরে কুয়াকাটায় দ্বিতীয় স্ত্রী আয়েশাকে নিয়ে ওই ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পর থেকেই সাইয়েদুল তার স্ত্রীর সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং তাকে শারীরিক নির্যাতন করেন। রাতের খাবারের পর কলহের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং রাত ১০টার দিকে সাইয়েদুল তার স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে ভেতর থেকে দরজা আটকে দেন। দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় সন্দেহ হয় পরিবারের সদস্যদের, পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সহায়তায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা ভেঙে সাইয়েদুলকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত কুয়াকাটা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিক তদন্তে এটি আত্মহত্যার ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ নিয়ে রহস্যের দানা বেঁধেছে স্থানীয়দের মাঝে।
ভুক্তভোগী পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, সাইয়েদুলের স্ত্রী আয়েশা প্রায় এক বছর আগে ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে সাইয়েদুলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে পারিবারিক বনিবনা নিয়ে টানাপোড়েন চলছিল বলে জানা গেছে। ঘটনার রাতে স্ত্রীকে মারধর ও গালাগাল করার তথ্যটি স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার সময় উপস্থিত প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, সাইয়েদুল ঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই ভেতরে অস্বাভাবিক নীরবতা বিরাজ করছিল, যা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে। ভুক্তভোগী আয়েশার অভিযোগ, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাইয়েদুল প্রায়ই মেজাজ হারিয়ে ফেলতেন এবং দাম্পত্য জীবনে কলহ নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে এই পারিবারিক সংকটের জের ধরে কোনো ব্যক্তি এমন চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কি না, তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং নিহতের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ঘটনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে, যাতে কোনো ধরনের প্ররোচনার প্রমাণ পাওয়া যায় কি না তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়।
মহিপুর থানার ওসি তদন্ত অনিমেষ হালদার জানিয়েছেন, পুলিশ খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দরজা ভেঙে মৃতদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য পটুয়াখালী মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সময় ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় এটি একটি আত্মহত্যার ঘটনা বলেই প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে, তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। বর্তমানে এই ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হলে তা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পারিবারিক কলহ নিরসনে সচেতনতার অভাব এবং মানসিক অস্থিরতা বর্তমান সমাজে বড় ধরনের সংকটে পরিণত হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সাথে জড়িত কোনো প্ররোচনা বা তৃতীয় পক্ষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হবে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কুয়াকাটার শান্ত জনপদে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে এবং পর্যটন এলাকায় ভাড়াটিয়াদের জীবনযাত্রার ওপর নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। পারিবারিক কলহের জেরে প্রাণহানির ঘটনাগুলো সামাজিক অবক্ষয়ের এক অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন সমাজ বিশ্লেষকরা। সাইয়েদুলের অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং এই মৃত্যুর প্রকৃত সত্য উদঘাটন এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংস বা আত্মঘাতী ঘটনা রোধে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং পারিবারিক কাউন্সিলিংয়ের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পুলিশ প্রশাসন এখন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। জননিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং পারিবারিক সহিংসতা রোধে স্থানীয় প্রশাসনকে এখন থেকে আরও বেশি সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
© স্বত্বাধিকার : আবেদীন প্রিন্টিং প্রেস ও সোহাগ কনস্ট্রাকশন