প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 5, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 3, 2026 ইং
বরগুনার আমতলীতে সেফটি ট্যাংকের বিষাক্ত গ্যাসে দুই শ্রমিকের মৃত্যু

আমতলী প্রতিনিধি: বরগুনার আমতলীতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের সেফটি ট্যাংকের সেন্টারিং খুলতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে দুই শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তদন্তে ভবন নির্মাণে নিরাপত্তা বিধানে চরম গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বরগুনার আমতলী একে স্কুল এলাকায় বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে একটি নির্মাণাধীন ভবনের সেফটি ট্যাংকের ভেতরে আটকা পড়ে জাহিদুল হাওলাদার ও জাফর হাওলাদার নামের দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ভবনটির মালিক স্থানীয় হোসাইনিয়া কামিল মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মো. ইউসুফ আলী। ঘটনার দিন সকালে শ্রমিক জাহিদুল ট্যাংকের সেন্টারিং খোলার জন্য ভেতরে প্রবেশ করলে বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পড়েন। তাকে উদ্ধারে জাফর হাওলাদার এগিয়ে গেলে তিনিও একইভাবে আটকা পড়ে অচেতন হয়ে যান। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর আমতলী ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল তাদের মরদেহ উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। মূলত বদ্ধ ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা কার্বন মনোক্সাইড ও ফরমালিন জাতীয় বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতিই এই মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজে নামানোয় স্থানীয়ভাবে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত শ্রমিকদের স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবন মালিকের অদূরদর্শিতা এবং নির্মাণকাজে ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকাই এই প্রাণহানির প্রধান কারণ। নিহত জাফরের ভগ্নিপতি রুহুল আমিন স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, ভবন মালিকের চরম অবহেলা ও অসচেতনতার ফলেই এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নির্মাণাধীন ভবনের সেফটি ট্যাংকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাজ করার সময় যে ধরনের অক্সিজেন সিলিন্ডার বা নিরাপত্তা সরঞ্জামের প্রয়োজন ছিল, তার কোনো কিছুই সেখানে উপস্থিত ছিল না। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এদিকে ঘটনার পরপরই বাড়ির মালিক মাওলানা মো. ইউসুফ আলী আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে জানা গেছে, যা তার দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাকেই জনসমক্ষে উন্মোচিত করছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে দ্রুত কাজ শেষ করার তাড়া থেকেই এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর আবু হানিফ জানিয়েছেন, সেফটি ট্যাংকের ভেতরে সৃষ্ট গ্যাস নিয়ন্ত্রণ এবং ভবনের কাঠামো ভেঙে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে তাদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি নিরসনে ভবন মালিক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যে দায়বদ্ধতা থাকার কথা ছিল, এখানে তার চূড়ান্ত অভাব লক্ষ্য করা গেছে। আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবু সাহাদাৎ মো. হাচনাইন জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে অভিযোগ সাপেক্ষে ভবন মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে পুলিশ আশ্বস্ত করেছে। নির্মাণাধীন ভবনে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি যে কতটা উপেক্ষিত, তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে পুনরায় স্পষ্ট হয়ে উঠল।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং নির্মাণ খাতে চলমান অনিয়ম ও তদারকির অভাবের একটি বড় দৃষ্টান্ত। নিয়মিত তদারকি ও নিরাপত্তা আইন মানার বাধ্যবাধকতা না থাকায় প্রতিনিয়ত সাধারণ শ্রমিকরা এমন ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষ করে সেফটি ট্যাংক বা বদ্ধ স্থানে কাজ করার ক্ষেত্রে যে নির্দিষ্ট কারিগরি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শ্রমিককে আর এভাবে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়। যথাযথ নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল নির্মাণ খাতের এই নৈরাজ্য রোধ করা সম্ভব।
© স্বত্বাধিকার : আবেদীন প্রিন্টিং প্রেস ও সোহাগ কনস্ট্রাকশন